প্রাচীন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সভ্যতা গুলো কি কি?

প্রাচীন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সভ্যতা গুলো কি কি

প্রাচীন সভ্যতা কাকে বলে?

সভ্যতা হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা। গবেষকদের মতে সভ্যতার মূল ভিত্তিগুলো হলো শহর, সরকার ব্যবস্থা, ধর্ম, সামাজিক কাঠামো, শিল্প এবং পরিপূর্ণ লিখন পদ্ধতি সমৃদ্ধ ‍ভাষা । আবার প্রতি ক্ষেত্রেই দেখা যায় একটি সভ্যতার আধিপত্য বিস্তার করার পেছনে কাজ করে তাদের আবিষ্কৃত এক বা একাধিক যুগান্তকারী আবিষ্কার, যার ফলে তারা তৎকালীন সময়ে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে সবার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। সুতরাং একটি সমাজব্যবস্থা থাকলেই তাকে সভ্যতা বলা যায় না। উল্লিখিত মূল ভিত্তিগুলোর পরিপূর্ণ উপস্থিতিই একটি সভ্যতা গঠন করে। তাই উল্লিখিত মূল ভিত্তিগুলো পূরণ করতে পারা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো কোন সমাজ ব্যবস্থাকেই প্রাচীন সভ্যতা বলা যায়।

প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস?

মানব জাতির ইতিহাস লক্ষ বছরের পুরোনো হলেও সেগুলো সভ্যতার পর্যায়ে পরে না।সভ্যতার ইতিহাস মাত্র কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শন পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর ভুমিতে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০০ সালে এই সভ্যতা গড়ে ওঠে। এই সভ্যতা থেকেই জন্ম হয় ব্যাবিলনীয়, অ্যাশেরীয়, ক্যালডীয় এবং সুমেরীয় সভ্যতার। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাও সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে একটি। গবেষকদের মতে এই সভ্যতার উৎপত্তি আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৩১০০ সালে। এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তর আফ্রিকার পূর্বাংশে। মেসোপটেমিয়া এবং মিশরীয় সভ্যতার সমসাময়িক আরেকটি সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৫০০ সালের দিকে দ্রাবিড় জাতি এই সভ্যতা গড়ে তোলে। ফিনিশীয় সভ্যতার সময়কাল ছিল আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২৫০০ সাল থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ৬৪ সাল পর্যন্ত। বর্তমান ইরানে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে গড়ে ওঠে পারস্য সভ্যতা। প্রাচীন চৈনিক সভ্যতা তিনটি অঞ্চলে নিয়ে গড়ে ওঠতে দেখা যায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০৭০ সালে। এছাড়াও এজিয়ান সভ্যতা নামের আরো একটি সভ্যতা দেখা যায় যা ৩২০০ থেকে ৩১০০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠে। এর অবস্থান ছিল এজিয়ান সাগরের দ্বিপপুঞ্জে। এই সভ্যতা ছিল গ্রীক সভ্যতার পুর্ব সভ্যতা। গ্রীক সভ্যতার বিকশিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব  ৮০০ থেকে ৬০০ সালে।তবে সবচেয়ে সফল সভ্যতা ছিল রোমান সভ্যতা। প্রায় হাজার বছরের সভ্যতা ছিল এটি। যুদ্ধবিগ্রহে পারদর্শী রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সাম্রাজ্য।এছাড়াও পেরুর দক্ষিনাংশে বিকাশ ঘটে ইনকা সভ্যতার যার ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৪৩৮-১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। মেক্সিকোর দক্ষিনাংশে এবং উত্তর মধ্য আমেরিকায় বিকশিত হয় মায়া সভ্যতা।

প্রাচীন যুগের সময়কাল?

মানবজাতির সময়কালের মধ্যে দির্ঘতম ছিল প্রাচীন যুগ যা আনুমানিক ৩৫০০ বছর স্থায়ী ছিল। মানব সভ্যতার সূচনা হয় এই প্রাচীন যুগে। বিভিন্ন সূত্র মতে প্রায় ১৩-১৪ টি সভ্যতা বিকশিত হয় এই সময়কালে। এর মধ্যে ৫০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, ৪০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সুমেরীয় সভ্যতা, ৩২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে এজিয়ান সভ্যতা, ৩১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মিশরীয় সভ্যতা, ২৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ফিনিশীয় সভ্যতা, ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে পারস্য সভ্যতা, ২০৭০ সালে চৈনিক সভ্যতা, ৮০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে গ্রীক সভ্যতা গড়ে ওঠে।রোমান সভ্যতার সময়কাল ছিল খ্রীষ্টপূর্ব ৭৫৩ সাল থেকে ৪৭৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত।

প্রাচীন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সভ্যতা গুলো কি কি?

প্রাচীন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সভ্যতা সমূহঃ

 

মেসোপটেমিয়া সভ্যতাঃ

মেসোপটেমিয়া শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ যার বাংলা অর্থ দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল। প্রত্নতাত্বিকদের মতে এখন পর্যন্ত খোজ পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হচ্ছে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা। এই অঞ্চল থেকেই সূচনা হয় ব্যাবিলনীয়, অ্যাশেরীয়, ক্যালডীয় এবং সুমেরীয় সভ্যতার। তাই এই মেসোপটেমিয়াকে সভ্যতার আতুরঘর বলা হয়। মেসোপটেমিয়া একটি  উর্বর এলাকা এবং কোন প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এই অঞ্চল বারবার শত্রুর আক্রমণের শিকার হয়। যার ফলে এই সভ্যতা কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। এই সভ্যতার উত্তর অংশের নাম এশেরীয়া এবং দক্ষিন অংশের নাম ব্যাবিলনীয়া। ব্যাবিলনীয়া আবার দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। ব্যাবিলনীয়ার উত্তরে আক্কাদ এবং দক্ষিনে সুমের নামে দুটি সাম্রাজ্য ছিল।  খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ হতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সাল ছিল এই সভ্যতার স্বর্নযুগ। এই অঞ্চল ২৫০ বছর রোমানদের অধীনে ছিল। তারপর ২য় শতক থেকে ৭ম শতক পর্যন্ত এই অঞ্চল পারস্যদের শাসনে ছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে এই অঞ্চল ইরাক নামে পরিচিত হয়।

সুমেরীয় সভ্যতাঃ

মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা ছিল সুমেরীয় সভ্যতা। এই সভ্যতা মূলত মেসোপটেমিয়ার একটি অংশ। মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য অংশশগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে উন্নত ছিল। এদের বাসস্থান ছিল এলামের পাহাড়ী অঞ্চলে। ধারণা করা হয় এই সভ্যতাই চাকা আবিষ্কার করেছিল। অক্ষর ভিত্তিক বর্ণমালা কিউনিফর্মও এরা আবিষ্কার করে।

ব্যাবিলনিয় সভ্যতাঃ

এটিও মেসোপটেমিয়ার একটি অংশ। সিরিয়ার মরূভূমি অঞ্চলে আমেরাইট জাতি এই সভ্যতা গড়ে তোলে। এই সভ্যতার স্থপতি ছিলেন হাম্মুরাবি। তারা প্রথম লিখিত আইনের প্রচলন করে। তারা গিলগামেশ নামক একটি মহাকাব্য রচনা করে।

অ্যাশেরীয় সভ্যতাঃ

এই সভ্যতার অবস্থান মেসোপটেমিয়ার উত্তর অংশে। এটি সামরিক কারণে পরিচিত ছিল। অ্যাশেরীয়রা প্রথম লোহার অস্ত্র এবং যুদ্ধরথের ব্যবহার করে। তারাই প্রথম অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের ব্যবহার করে এবং বৃত্তকে ৩৬০তে ভাগ করে।

ক্যালডীয় সভ্যতাঃ

এই সভ্যতা গড়ে ওঠে ব্যবিলনকে কেন্দ্র করে। তাই একে নব্য ব্যবিলনীয় সভ্যতাও বলা হয়। এই সভ্যতার স্থপতি নেবুচাঁদনেজার। তিনি ‘ব্যাবিলনের শূন্যউদ্যান’ নির্মান করেন যা সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম। তারা সাত দিনে সপ্তাহ এবং ২৪ ঘন্টায় দিনের ধারণা আনেন। ১২টি রাশিচক্রেরও সৃষ্টি করেন তারা।

মিশরীয় সভ্যতাঃ

প্রাচীন যুগে প্রায় ১২ লক্ষ বছর আগে থেকে এখানে মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়।মূলত নীল নদ এই অঞ্চলে সভ্যতা স্থাপনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০ সালে প্রথম ফারাও তৎকালিন মিশরের দুই অংশ এক করে দিলে এই সভ্যতা সুসংহত হয়। পরবর্তী তিন হাজার বছর এই সভ্যতার জয়যাত্রা বজায় ছিল। মিশরীয়দের গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারের মধ্যে ছিল গণিত, স্থাপত্যবিদ্যা ইত্যাদি। খ্রিস্টপূর্ব ৩১ সালে রোমানরা মিশর দখল করে নিলে মিশরীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

সিন্ধু সভ্যতাঃ

ধারণা করা হয় সিন্ধু নদের তীরে বিকশিত এই সভ্যতা মেসোপটেমিয়া এবং মিশরীয় সভ্যতার সমসাময়িক। এই সভ্যতার উল্লেখযোগ্য দুটি শহর হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো।এই সভ্যতার বেশিরভাগ মানুষ কৃষি কাজ করতো। পরিমাপ পদ্ধতি ছিল এই সভ্যতার গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কার।

ফিনিশীয় সভ্যতাঃ

এই সভ্যতার অবস্থান ছিল বর্তমান লেবানন এবং সিরিয়া ও গালীলের কিছু উপকূলীয় এলাকা নিয়ে। খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের মধ্যে এই সভ্যতা লেভান্ত থেকে ইবেরীয় উপদ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে। এই সভ্যতায় ব্যবহৃত বর্ণমালা খোজ পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন বর্ণমালা।

পারস্য সভ্যতাঃ

পারস্যের অবস্থান ছিল বর্তমান ইরানে। আর্য জাতি এই সভ্যতা গড়ে তোলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের মধ্যে। এদের সামরিক শক্তি ছিল অতুলনীয়। এরা দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থার জন্যে বিখ্যাত। এরা একটি নতুন ধর্ম জরাথ্রুস্টবাদের প্রচলন করেন। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার পারস্য সাম্রাজ্য অধিকার করে নিলে এই সভ্যতার পতন ঘটে।

গ্রীক সভ্যতাঃ

গ্রিক জাতির দ্বারা এই সভ্যতার সূচনা হয়। এই অঞ্চলের ভৌগরিক কারণে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে ভাগ হয় দেশটি। গ্রিসের উল্লেখযোগ্য শহর হলো এথেন্স ও স্পার্টা। এথেন্স সর্বপ্রথম গনতন্ত্র ধারনার জন্ম দেয়। এই সভ্যতা গড়ে ওঠে ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে। গ্রীকরা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। গ্রীক মিথলজিতে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়। জ্ঞানে-বিজ্ঞনে-সাহিত্যে তৎকালীন গ্রীস অতুলনীয় ছিল। বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল গ্রীক সভ্যতাকে উন্নত করেছেন। গ্রীক মহাকবি হোমার ইলিয়াড এবং ওডিসির মতো মহাকাব্য রচনা করেছেন। খেলাধুলাতেও গ্রীকদের অবদান অনেক। অলিম্পিক গেমসের ধারণা তারা প্রথম তৈরী করেন।

রোমান সভ্যতাঃ

বেশিরভাগ প্রাচীন সভ্যতা নদীকেন্দ্রীক হলেও রোমান সভ্যতায় তা ছিল না। রোমানরা প্রথমে উত্তর ইতালিতে বসতি গড়ে তোলে। রোমান রাজা রোমিউলাস রোম নগরীর পত্তন করেন।রোমের অর্থনীতি ছিল দাস নির্ভর।দাস বিদ্রোহের পর জুলিয়াস সিজার ক্ষমতায় আসেন। পরবর্তীতে রোমান রাজা এন্টনি মিশরের রাজকন্যা ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করে ক্ষমতা সুসংহত করেন। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এই শক্তিশালী সভ্যতার পতন হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছে কোথায়?

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছে মেসোপটেমিয়ায়। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার নাম মেসোপটেমিয়া সভ্যতা যা গড়ে ওঠেছে বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ সালে এই সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়। সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, আসেরীয় সভ্যতা ও ক্যালডীয় সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া সভ্যতারই অংশ।

উত্তরাংশের নাম ছিল এশেরীয়া এবং দক্ষিণাংশের নাম ছিল ব্যাবিলনিয়া। ব্যাবিলোনিয়ার উত্তরে আক্কাদ ও দক্ষিণে সুমের নামে দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই দুটি জনগোষ্ঠির সৃজনশীলতার ফসলই হল মেসোপটেমিয়া সভ্যতা।

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!